বাংলাদেশের মানুষ প্রতিনিয়ত বসবাস করছে শিল্পের সাথে। যাদের হাত দিয়ে রচিত হয়েছে এই দেশের হাজার বছরের লোকশিল্পের। তাদের ছিল না কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। বংশ-পরম্পরায় এইসব স্থানীয় লোকশিল্পীরা রচনা করেছেন এই ইতিহাস। যা আজ আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির মূল শিকড়। তেমনি একদল স্থ্বশিক্ষিত শিল্পের হাত দিয়ে পঞ্চাশের দশকে রচিত হয়েছে এই দেশের রিকশা পেইন্টিং এর ইতিহাস। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত এই তিন চাকার যানবাহনকে নিজেদের শৈল্পিক চিন্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত রাঙিয়ে যাচ্ছেন এইসব শিল্পী। 

রিক্সার চিত্র


এই যেন হাজার বছরের লোকশিল্পের এক নতুন সূচনা। একটি রিক্সায় অনেকগুলো অংশ থাকে যার প্রত্যেকটি অংশ তৈরীর জন্য আলাদা আলাদা কারিগর রয়েছে। তার মধ্যে রিকশা পেইন্টারো রয়েছে। এইসব শিল্পী মূলত রিক্সার পেছনের পাতলা টিনের সিটের ওপর ছবি আঁকেন। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন হয়েছে রিকশা পেন্টিং এর ছবির বিষয় বস্তুতে। প্রথম দিকে রিক্সা পেইন্টিং এর বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য ছিল নায়ক, নায়িকার ছবি। এরপরে প্রাধান্য পায় রাজধানী ঢাকাতে কেন্দ্র করে আঁকা কাল্পনিক শহরের ছবি। একসময়ে রিকশা পেন্টিং এর মানুষ আঁকা বন্ধ হয়ে যায়। সেসময় শিল্পীরা মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন পশু পাখি আঁকা শুরু করেন। যেমন_ বাঘ বসে সেলাই করছে সেলাই মেশিনে। শিয়াল করছে ট্রাফিক কন্ট্রোল। খরগোশ ছানা চলেছে স্কুলে পিঠে ব্যাগ নিয়ে ইত্যাদি কাল্পনিক বিষয় উঠে আসে রিক্সে শিল্পীদের ছবিতে।

তাছাড়া_ বোরাক,দুলদুল, আরব্য রজনীর রাজপ্রাসাদ, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ও দৈত্য, তাজমহল, লন্ডন ব্রীজ, আইফেল টাওয়ার সহ দেশ-বিদেশের কাল্পনিক ছবি এই সময় রিকশা পেইন্টিং স্থান পায়। স্বাধীনতার পরে রিকশা পেন্টিং এ উঠে এসেছে স্মৃতিসৌধ, সংসদ ভবন, শহীদ মিনার সহ মুক্তিযুদ্ধের নানা দৃশ্য। বর্তমান সময়ের যমুনা সেতু পদ্মা সেতু ব্যস্ত শহরের দৃশ্য যেখানে ফ্লাইওভার রাস্তা ও বিমানবন্দর একসাথে আঁকা আছে মৎস্যকন্যা নদী আর গ্রাম ইত্যাদি বিষয়ে উঠে এসেছে। এছাড়া শিল্পীরার রিক্সা অলংকরণের জন্য বিভিন্ন ফুল লতা পাতা ময়ূর হাঁস ইত্যাদি ছবি আঁকেন। 


এভাবে সময়ের পরিবর্তনের এক অঙ্কিত দলিল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের এই রিক্সা আর্ট।

রিক্সার আর্টের শিল্পীরা রিক্সার হুডের পেছনের অংশ এবং পেছনের চাকার উপরের গোল অংশ সহ বিভিন্ন স্থানে অলংকরণের জন্য আল্লাহু, মা, ধন্যবাদ সহ বিভিন্ন ধরনের লেখা ব্যবহার করেন যা তাদের নান্দনিক ক্যালিগ্রাফির প্রকাশ। দেশের এক একটি রিকশা যেন এক একজন শিল্পীর হাতে একা চলমান শিল্পকর্ম। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে আমাদের দেশের রিকশা পেন্টিং।

যার নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য সম্মানের বিষয়

বাংলাদেশের রিক্সার্টে দু ধরনের অঙ্গসজ্জা দেখা যায়। প্রথমটা হচ্ছে রিক্সা এপ্লিক আর্ট দ্বিতীয়টা হলো রিকশা পেন্টিং।


রিকশা পেইন্টিং এর ক্ষেত্রে শিল্পীরা পাতলা টিন ব্যবহার করেন। শিল্পীরা প্রথমে টিনের পাতলাশীট এর উপর সাদা এনামেল রং এর প্রলেপ দিয়ে নেন। রং শুকানোর পর তার ওপর পেন্সিল দিয়ে বিষয়বস্তুটি হালকা ভাবে এঁকে নেন। তারপর বিষয়বস্তুতে রং এর প্রলেপ দেওয়া শুরু করেন। রিকশা পেইন্টিং এর জন্য শিল্পীরা এনামেল রং ব্যবহার করেন। উজ্জ্বল নীল, গোলাপি, সবুজ, বাদামী, হলুদ প্রভৃতি রঙের ব্যবহার করেন শিল্পীরা। যেহেতু এনামেল রং শুকোনোর সাথে সাথে আঠালো হয়ে ওঠে, তাই শিল্পীরা দ্রুত ছবির বিষয়বস্তুতে রংয়ের প্রলেপ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেন। ছবি আঁকার সময় রংয়ের ঘনত্ব বেড়ে গেলে তাতে তারপিন তেল মিশিয়ে পাতলা করে নেন শিল্পীরা। রিক্সা পেইন্টিং এর জন্য শিল্পীরা কাঠবিড়ালি লোন দিয়ে তৈরি তুলিসহ বিভিন্ন রকমের তুলে বাজার থেকে সংগ্রহ করে ব্যবহার করেন। বিষয়বস্তুতিতে রং দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হলে তাতে কাল অথবা গারো রং দিয়ে সুখ্য রেখা ব্যবহার করেন। এরপর বিষয়বস্তুতে সাদা অথবা হালকা রং দিয়ে সুখ্য রেখার সাহায্যে আলোর ব্যবহারকে তুলে ধরেন। গতিশীল রেখার এই ব্যবহারই হল রিক্সা পেইন্টিং এর মূল বৈশিষ্ট্য। এরপর শিল্পের স্বাক্ষর দিয়ে তাদের শিল্পকর্ম সম্পন্ন করেন। এই শিল্প টাকে আরও জনপ্রিয় করার জন্য বর্তমানে গৃহসজ্জা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের অনেক সামগ্রিকের রিকশা পেন্টিং দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছে। এই শিল্প আমাদের নিজস্ব তাই একে প্রচার আর প্রসারের মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ যে দেশের শিল্পী ও সংস্কৃতি যত বেশি সমৃদ্ধ সে জাতি তত বেশি উন্নত। 

Join Facebook group