আমানত সেবা;

আমরা যা আয় করে বা বিভিন্ন সময়ে যে অর্থ পাই, তার সবটাই খরচ করি না। সাধারণত আয় থেকে সব ধরনের খরচ বা ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত অর্থকে আমরা সঞ্চয় বুঝি। আবার অনেক সময় বিভিন্ন উৎস থেকেও আমাদের কাছে অর্থ আসতে পারে; যা আমাদের কাছে গচ্ছিত অবস্থায় থাকে। টাকা সঞ্চিত ও গচ্ছিত রাখার নিরাপদ জায়গা হল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদী হিসাব খুলে টাকা রাখা নিরাপদ ও লাভজনক। 

চলতি আমানত বা কারেন্ট ডিপোজিট হিসাব মূলত প্রতিষ্ঠানের নামে বা ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেনের উদ্দেশ্যে খোলা হয়। এ ধরনের হিসাব প্রতিদিন একাধিকবার টাকা জমা বা উত্তোলন করা যায় এবং আমানতের ওপর খুব সামান্য পরিমাণ মুনাফা দেওয়া হয়। সাধারণ জনগণের জন্য এ ধরনের হিসাব লাভজনক নয়।

ব্যবসায়িক লেনদেন


সঞ্চই আমানত বা সেভিংস ডিপোজিট হিসাবে ব্যক্তি নামে খোলা হয় যেখানে প্রতিদিনের বাড়তি টাকা কোন চার্জ বা ফি ছাড়াই প্রতিদিন জমা করা যায় এবং সপ্তাহে নির্দিষ্ট সংখ্যক বার উত্তোলন করা যায়। এই আমানতের স্থিতির উপর ভিত্তি করে ব্যাংক নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে ৪% থেকে 5% মুনাফা প্রদান করে থাকে। অবশ্য যা ব্যাংক বেধে এবং দেশের আর্থিক নীতি অনুসারে মুনাফার ওঠানামা করে। সঞ্চয়ী হিসেবে পরিচালনার জন্য কোন কোন ব্যাংক আমানতকারীকে চেক বইয়ের পাশাপাশি এটিএম বা ডেবিট কার্ড ও সরবরাহ করে থাকে, যা ব্যবহার করে গ্রাহকরা সহজেই দেশের যেকোনো প্রান্তে স্থপিত এটিএম বুথ থেকে যেকোনো সময় টাকা উত্তোলন করতে পারেন। প্রত্যাহিত প্রয়োজনে যেমন; টাকা জমা করা, টাকা তোলা, টাকা পাঠানো ও সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ভাতা সুবিধাগুলো সরাসরি জমা করার ক্ষেত্রে এ ধরনের আমানত হিসাব অত্যন্ত উপযোগী। 


মিয়া দিয়ে আমানত বা টার্ম ডিপোজিট হিসাব সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত টাকা জমা রাখার জন্য খোলা হয়। যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য টাকা জমা রাখা হয়, সেহেতু এই আমানত থেকে সঞ্চয় আমানতের তুলনায় বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। তবে এ হিসাব চলতি বা সঞ্চয় হিসাবের মাধ্যমে ব্যবহার করা না গেলেও মেয়াদ পূর্তির আগে জরুরি প্রয়োজনে এ হিসাব থেকেও টাকা তোলা যায়, সে ক্ষেত্রে মুনাফা কিছুটা কম পাওয়া যায়। মেয়াদী আমানত বন্ধক রেখে এর বিপরীতে ঋণ ও গ্রহণ করা যায়। নিকট ভবিষ্যতে শান্তিতে টাকার খুব দরকার না থাকলে এই হিসাবে টাকা রাখা তুলনামূলক লাভজনক।


বিশেষ ডিপোজিট স্কিম এক ধরনের ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ী হিসাব। এই হিসাবের মাধ্যমে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর একসঙ্গে অনেক টাকা পাওয়া যায়। যেমন ধরা যাক, একজন মানুষ যদি এ ধরনের সন্ত্রাস হিসেবে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা করে জমান তাহলে তিনি পাঁচ বছর পর আনুমানিক ৭৬ হাজার টাকা পাবেন (সূত্র; সোনালী ব্যাংক, ২০১৮)। আবার একজন শিক্ষার্থী যদি শিক্ষার ডিপোজিট স্কিমের আওতায় প্রতিমাসে মাত্র ৫০০ টাকা করে জমাতে থাকেন, তাহলে ১০ বছর পর সে আনুমানিক ৯২ হাজার টাকা পাবেন। এ ধরনের স্কিমের আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা নির্দিষ্ট সময়ান্তে দ্বিগুণ বা তিনগুণ হবার ও সুযোগ আছে। 




 বিনিয়োগ সেবা; লাভের আশায় সঞ্চয় বা গচ্ছিত টাকা ব্যাংকে না রেখে কোথাও ব্যবহার বা লগ্নী করাকে সাধারণ অর্থে বিনিয়োগ বলা হয়। যেমন: ব্যবসায় খাটানো, জমি কেনা, সঞ্চয়পত্র বা ব্যান্ডে বিনিয়োগ করা, স্বর্ণ ক্রয়, শেয়ার ক্রয় ইত্যাদি। এসব বিনিয়োগ খাত গুলো আলাদা এবং প্রতিটি খাতের আয় ও ঝুঁকির পরিমাণও আলাদা। যেমন: ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মুনাফা ও ঝুঁকি উভয়ই অধিক। আবার জমি বা স্বর্ণ ক্রয় করার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। তবে এই দুটি ক্ষেত্রেই কেনার সময় অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন হয়। কারণ, কোন কারনে ভেজাল জমি বা সোনা কিনলে বিনিয়োগের সবটাই নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকে। 



বিনিয়োগের আরেকটি ক্ষেত্র হলো শেয়ার বাজার বা স্টক মার্কেট। এই বাজারে বিভিন্ন কোম্পানি শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করা হয়। কোন কোম্পানি শেয়ার ক্রয় করা মানে সেই কোম্পানির অংশীদার হয়ে যাওয়া অর্থাৎ সেই কোম্পানির মালিকানার অংশ হয়ে যাওয়া। যখন কোন কোম্পানি ব্যবসা বড় করতে চায় বা নতুন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে চায়, তখন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে জনসাধারণের কাছে স্টক বা শেয়ার বিক্রি করে। শেয়ার কেনার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা আশা করেন এই শেয়ারের মূল্য সময়ের সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে, যা বিক্রি করে তারা লাভবান হবেন অথবা কোম্পানির ব্যবসার মাধ্যমে যে লাভ হবে তার লভ্যাংশ পাবেন। একটি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বিভিন্ন কারণে বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে। এটা নির্ভর করে কোম্পানিতে আর্থিকভাবে কতটা ভালো করেছে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন এবং শেয়ার বাজারের সার্বিক অবস্থার ওপর। কোম্পানির আয় বা নতুন পণ্য সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য যেমন কম্পানির শেয়ার মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে, তেমনি কোম্পানি সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য মূল্য হ্রাস ঘটাতে পারে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি সঠিকভাবে কোম্পানি নির্বাচন করে শেয়ার ক্রয় করলে অনেক লাভ হওয়াও সম্ভাবনা থাকে। শেয়ারবাজারে শেয়ারের মূল্য কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। আবার একটি কোম্পানি বা একটি সেক্টরে বিনিয়োগ না করে বিভিন্ন কোম্পানি বা সেক্টর বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কমে। বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হল সরকারি সঞ্চয়পত্র বা বন্ডে বিনিয়োগ করা। আমাদের দেশের এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে যেমন;

পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র: এই সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা মুনাফা পাওয়া যায়। তবে কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও ৬৫ বছরের বেশি পুরুষ এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এই সঞ্চয় পত্রের সর্বনিম্ন বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ১০ হাজার টাকা। সেসব পরিবার তাদের সঞ্চিত অর্থের আয়ের ওপর নির্ভরশীল এবং কোনভাবে তাদের শেষ সম্বল সঞ্চয়টুকু নষ্ট করতে চান না তাদের জন্য এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সর্বোত্তম। 

তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয় পত্র: এটি এক ধরনের বিনিয়োগ মূলক সঞ্চয়পত্র। প্রতি তিন মাসে এই সঞ্চয় পত্রের মুনাফা উঠানো যায়। যদি কোন ব্যক্তি বা পরিবারের নির্দিষ্ট সময় আনতে সঞ্চিত অর্থের আয় প্রয়োজন হয়, তাহলে তাদের জন্য এই সঞ্চয় পার্টি বিনিয়োগ উত্তম। এই সঞ্চয়পত্র যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ক্রয় করতে পারবেন। 
এসব সঞ্চয়পত্র ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র ও বন রয়েছে। যেমন; পেনশনার সঞ্চয় পত্র, প্রাইজ বন্ড, ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেসমেন্ট বন্ড ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যায় এবং যেকোনো ধরনের সঞ্চয়পত্র বন্ডে বিনিয়োগে কোনরূপ আর্থিক ঝুঁকি নেই।

EDUCATION BANGLA